ইসলামে সন্তান—ছেলে হোক বা মেয়ে—বালেগ (প্রাপ্তবয়স্ক) হয়ে গেলে তো বটেই, এমনকি বালেগ হওয়ার আগেই নির্দিষ্ট বয়সে উপনীত হলে মা-বাবা এবং ভাই-বোনদের বিছানা পৃথক করার স্পষ্ট ও কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নিচে কুরআন, হাদিস এবং ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে এ সংক্রান্ত বিধান, বয়সের সীমা এবং এর সার্বিক দিক বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. কত বছর বয়সে বিছানা পৃথক করতে হবে?
ইসলামে সন্তান ১০ বছরে পদার্পণ করলেই বিছানা আলাদা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তা সে বালেগ হোক বা না হোক। আর বালেগ হয়ে গেলে এক বিছানায় শোয়া সম্পূর্ণ হারাম ও কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
হাদিসের নির্দেশ:
হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বয়সের একটি স্পষ্ট সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছেন:
"তোমাদের সন্তানদের বয়স যখন সাত বছর হয়, তখন তাদের সালাত (নামাজ) আদায়ের নির্দেশ দাও। আর যখন তাদের বয়স ১০ বছর হয়, তখন সালাতের জন্য তাদের প্রহার করো (শাসন করো) এবং তাদের শোয়ার বিছানা পৃথক করে দাও।"
(সুনানে আবু দাউদ: ৪৯৫, সু নান তিরমিজি)
ইসলামি ফকিহ ও আলেমাদের মতে, এই নির্দেশ শুধু ভাই-বোনদের ক্ষেত্রে নয়, বরং মা-ছেলে এবং বাবা-মেয়ের ক্ষেত্রেও সমভাবে প্রযোজ্য।
২. বালেগ হওয়ার পর মায়ের সাথে একই বিছানায় শোয়ার বিধান
ছেলে বালেগ বা প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে গেলে মায়ের সাথে একই কাঁথা বা কম্বলের নিচে এবং একই বিছানায় গায়ের সাথে গা লাগিয়ে ঘুমানো শরিয়তের দৃষ্টিতে স্পষ্ট হারাম (নাজায়েজ)।
পর্দা ও শালীনতার বিধান: বালেগ হওয়ার পর ছেলের জন্য মায়ের শরীরের নির্দিষ্ট স্থান (যেমন: সতর) ঢাকা থাকা শর্তেও এক বিছানায় শোয়া গোনাহের মাধ্যম হতে পারে।
একই কক্ষে শোয়া: যদি ঘরের সংকটের কারণে একই রুমে ঘুমাতে হয়, তবে অবশ্যই বিছানা আলাদা হতে হবে এবং গায়ের কাঁথা/লেপও পৃথক হতে হবে। তবে বালেগ ছেলের জন্য মায়ের সাথে আলাদা রুমে ঘুমানোই উত্তম ও নিরাপদ।
৩. কুরআনের নির্দেশনা: অনুমতি নেওয়ার বিধান
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা সন্তান বালেগ হলে ঘরে বা মায়ের রুমে প্রবেশের ক্ষেত্রে অনুমতি নেওয়ার বিধান দিয়েছেন, যা থেকে বোঝা যায় যে ইসলামে বয়ঃসন্ধিকালের পর শালীনতা বজায় রাখা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
"আর তোমাদের সন্তানরা যখন বয়ঃপ্রাপ্ত (বালেগ) হয়, তখন তারাও যেন অনুমতি প্রার্থনা করে—যেমন অনুমতি প্রার্থনা করে থাকে তাদের বয়োজ্যেষ্ঠরা..."
(সূরা আন-নূর: ৫৯)
এমনকি শৈশবেও ৩টি গোপনে থাকার সময়ে (ফজর, দুপুর ও এশার পর) রুমে প্রবেশের জন্য অনুমিত নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে (সূরা আন-নূর: ৫৮)।
৪. বিছানা পৃথক না করার ভয়াবহতা ও ইসলামি প্রজ্ঞা
ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যা প্রবৃত্তি ও শয়তানের চক্রান্ত থেকে মানুষকে রক্ষা করার জন্য আগে থেকেই সতর্কতামূলক পদক্ষেপ (Prevention) গ্রহণ করে। বিছানা আলাদা না করার সম্ভাব্য ভয়াবহতাগুলো হলো:
মনস্তাত্ত্বিক ও শারীরিক পরিবর্তন: বয়ঃসন্ধিকালে (Puberty) শারীরিক ও মানসিক নানা পরিবর্তন ঘটে। এই সময়ে মা বা পরিবারের কারো ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে থাকাটা কুপ্রবৃত্তি জেগে ওঠার কারণ হতে পারে (নাউজু বিল্লাহ)।
শয়তানের ধোঁকা: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "শয়তান মানুষের রক্তনালীতে বিচরণ করে।" যে কোনো অস সতর্ক মুহূর্তে শয়তান মানসিক কুচিন্তা বা জঘন্য কোনো গোনাহের পথ খুলে দিতে পারে।
পারিবারিক ও মানসিক বিপর্যয়: বর্তমানে বিশ্বজুড়ে এবং সমাজে এমন অনেক অপ্রীতিকর ও জঘন্য পারিবারিক অনৈতিকতার খবর পাওয়া যায়, যার সূচনা হয়েছিল কেবল শৈশব/কৈশোরে একই বিছানায় ঘুমানোর অসাবধানতা থেকে।
লজ্জাশীলতার অবক্ষয়:
ছোটবেলা থেকে স্থান পৃথক না করলে সন্তানের ভেতর থেকে সঠিক শালীনতা, লজ্জা এবং আত্মমর্যাদাবোধ কমে যায়।
🖋️ইউসুফ বিন বাশার আল আযহারী,
ইসলামিক থিউলজি ডিপার্টমেন্টে
আল আযহার বিশ্ববিদ্যালয়। কাইরো মিশর।




